মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ‘খুব শিগগিরই’ খুলে যাবে। আর তা না হলে ইরানকে ‘খুব কঠোরভাবে আঘাত’ করা হবে। এদিকে, হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হতে পারে—এমন আশায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম তিন সপ্তাহের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। খবর বিবিসি।
ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে এবং চলতি সপ্তাহের শেষ দিকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার শুরু হতে পারে।
গতকাল আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের নিচে নেমে আসে। সরবরাহে বিঘ্ন কমতে পারে—এমন প্রত্যাশাই এ দরপতনের মূল কারণ। আজ এশিয়ার লেনদেনেও দাম আরো প্রায় দশমিক ৭ শতাংশ কমে।
তবে গত কয়েক মাসে সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে আগের দফার আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ভোক্তাদের ওপর, কারণ জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় গাড়িচালকদের ব্যয়ও বাড়ছে।
ক্যালিফোর্নিয়া সফরের সময় ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের আলোচনা খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে।’ তার দাবি, কয়েক মাসের সংঘাতের অবসান ঘটাতে ইরানও একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্তর্জাতিক জলসীমা দিয়ে চলাচলকারী সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত ও নিরাপদ রয়েছে।
গতকাল ব্রেন্ট ক্রুডের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও ৫ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৬ ডলারে নেমে আসে। উভয় ধরনের তেলের দামই ১৩ জুলাইয়ের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়।
মার্কো রুবিও বলেন, ইরান ও ওমানের সঙ্গে আলোচনায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে আরো বেশি জাহাজ চলাচলের বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে, তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা আশা করছি খুব শিগগিরই সেটি হবে।’
স্কট বেসেন্ট বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার বিষয়ে সমঝোতা মঙ্গলবার বা বুধবারের মধ্যেই হতে পারে।
জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান ফি আদায় করতে পারবে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে বেসেন্ট বলেন, ‘এটি হবে অবাধ চলাচলের ব্যবস্থা।’
মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তারা আলোচনায় অগ্রগতির কথা বললেও সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত বা কাঠামো সম্পর্কে এখনো কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে ইরান বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা করছে না এবং এমন কোনো পরিকল্পনাও নেই। বরং তারা ওমানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, মধ্যস্থতাকারী ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নতুন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা ইতিবাচক হয়েছে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে অন্যতম মধ্যস্থতাকারী কাতারও জানিয়েছে, তারা অন্য মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনা নির্ধারিত নেই।
এদিকে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশ্বিক মজুদের প্রায় পুরোটাই ব্যবহার করে ফেলেছে বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজকে জানিয়েছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় হরমুজ প্রণালি অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরুর আগে এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের দৈনিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো।
সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ রেখেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ওই অঞ্চলে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করেছে।
এদিকে ২০ জুলাই থেকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বন্দরগুলোর ওপরও অবরোধ আরোপ করেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর লোহিত সাগরের এ পথটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুটে পরিণত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে একের পর এক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটায় পথটি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গতকাল ইয়েমেন উপকূলের কাছে একটি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সেটি ডুবে যায় বলে ভারতের নৌপরিবহনমন্ত্রী জানিয়েছেন। জাহাজে থাকা ১৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে তেলবাহী জাহাজগুলোর জন্য ঝুঁকি এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।